পিফাস কি ? পিফাস মানবদেহের জন্য কতটা ক্ষতিকর জানুন

পিফাস কি ? পিফাস মানবদেহের জন্য কতটা ক্ষতিকর জানুন

2026 সালে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় ঢাকার ওয়াসার খাবার পানিতে পিফাস নামক ক্যান্সার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক পাওয়া গিয়েছে আজকের এই পোস্টে আমরা পিফাস কি ? পিফাস মানবদেহের জন্য কতটা ক্ষতিকর তা জানবো ।

পিফাস (PFAS) কী?

​PFAS-এর পূর্ণরূপ হলো Per- and Polyfluoroalkyl Substances। এটি মানবসৃষ্ট কৃত্রিম রাসায়নিক যৌগের একটি বড় গোষ্ঠী, যেখানে প্রায় ৯,০০০ থেকে ১৫,০০০-এরও বেশি ভিন্ন ভিন্ন রাসায়নিক উপাদান রয়েছে। ১৯৪০-এর দশক থেকে শিল্পকারখানায় বিভিন্ন পণ্য তৈরিতে এই রাসায়নিকের ব্যবহার শুরু হয়।

পিফাসের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি পানি, তেল, দাগ এবং তাপ প্রতিরোধ করতে পারে। তবে বিজ্ঞানীদের কাছে পিফাস সবচেয়ে বেশি পরিচিত “ফরএভার কেমিক্যালস” (Forever Chemicals) বা “চিরস্থায়ী রাসায়নিক” হিসেবে। এর কারণ হলো পিফাস অণুর মধ্যে কার্বন ও ফ্লোরিনের বন্ধন (Carbon-Fluorine Bond) অত্যন্ত শক্তিশালী, যা প্রাকৃতিক পরিবেশে বা মানবদেহে সহজে ভেঙে যায় না বা বিনষ্ট হয় না। ফলে এটি হাজার বছর ধরে পরিবেশে টিকে থাকে এবং ধীরে ধীরে মানবদেহে জমা হতে থাকে।

আমরা কীভাবে পিফাসের সংস্পর্শে আসি?

আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অজস্র পণ্যে পিফাস ব্যবহৃত হয়:

  • ​নন-স্টিক বাসনাপত্র: রান্নাঘরের নন-স্টিক বা টেফলন কোটিংযুক্ত প্যান।
  • ​খাবারের প্যাকেজিং: ফাস্টফুডের রঙিন মোড়ক, পপকর্ন ব্যাগ ও পিৎজার বক্স।
  • ​পোশাক ও কাপড়: ওয়াটারপ্রুফ বা রেইনকোট, দাগ-প্রতিরোধী কার্পেট ও সোফার ফেব্রিক।
  • ​প্রসাধন সামগ্রী: ওয়াটারপ্রুফ মাসকারা, মেকআপ এবং সানস্ক্রিন।
  • ​শিল্প বর্জ্য ও পানি: পোশাক ও চামড়া কারখানার বর্জ্য মিশ্রিত কলের পানি বা নদীর পানি।

পিফাস মানবদেহের জন্য কতটা ক্ষতিকর?

​পিফাস যখন পানি, খাদ্য বা শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে, তখন এটি দীর্ঘকাল ধরে রক্ত, লিভার এবং কিডনিতে জমা হতে শুরু করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণা অনুযায়ী, পিফাসের সংস্পর্শ মানবদেহে একাধিক মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করে:

​১. ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি

​আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা (IARC) পিফাসের অন্তর্ভুক্ত PFOA-কে মানুষের জন্য কার্সিনোজেনিক (ক্যান্সার সৃষ্টিকারী) হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দীর্ঘমেয়াদে পিফাসযুক্ত পানি পান বা খাবার গ্রহণের ফলে বিশেষ করে কিডনি ক্যান্সার, অণ্ডকোষের (Testicular) ক্যান্সার, প্রস্টেট এবং স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

​২. অনাক্রম্যতা বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস

​পিফাস মানবদেহের প্রাকৃতিকভাবে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু বা প্রাপ্তবয়স্ক উচ্চমাত্রার পিফাসের সংস্পর্শে আসে, তাদের শরীরে ভ্যাকসিনের বা টিকার কার্যকারিতা কমে যায় এবং তারা সহজে বিভিন্ন সংক্রমণে আক্রান্ত হয়।

৩.হরমোন ও থাইরয়েডের ভারসাম্যহীনতা

​পিফাস একটি শক্তিশালী এন্ডোক্রাইন ডিসরাপ্টর (Endocrine Disruptor) বা হরমোন বিঘ্নকারী উপাদান। এটি থাইরয়েড হরমোনের স্বাভাবিক নিঃসরণ ব্যাহত করে থাইরয়েডের সমস্যা তৈরি করে, যা শরীরের বিপাকক্রিয়াকে (Metabolism) বিপর্যস্ত করে তোলে।

​৪. প্রজনন স্বাস্থ্য ও গর্ভস্থ শিশুর ক্ষতি

​নারী ও পুরুষ উভয়ের প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য পিফাস চরম বিপজ্জনক। এটি পুরুষদের শুক্রাণুর সংখ্যা ও গুণমান কমায় এবং নারীদের গর্ভধারণে জটিলতা সৃষ্টি করে। গর্ভবতী মায়ের শরীরে পিফাস থাকলে তা প্লাসেন্টা পার হয়ে ভ্রূণে প্রবেশ করে, যার ফলে কম ওজনের শিশু জন্মগ্রহণ করা, গর্ভপাত কিংবা শিশুর জন্মগত ত্রুটি দেখা দিতে পারে।

৫.লিভার ও কিডনির ক্ষতি

​শরীরের বর্জ্য নিষ্কাশনকারী অঙ্গ লিভার ও কিডনিতে পিফাস জমে স্থায়ী ক্ষতি সাধন করে এছাড়াও ফ্যাটি লিভার, এনজাইম বৃদ্ধি, রক্তে উচ্চ কোলেস্টেরল এবং উচ্চ রক্তচাপ (Preeclampsia) সৃষ্টি করতে পারে।

​পিফাস থেকে বাঁচার উপায়

সম্পূর্ণরূপে পিফাস মুক্ত হওয়া কঠিন হলেও দৈনন্দিন অভ্যাসে কিছু পরিবর্তন এনে এর ঝুঁকি কমানো সম্ভব:

  • ​নন-স্টিক কুকওয়্যারের বদলে স্টেইনলেস স্টিল, লোহা (Cast Iron) বা মাটির পাত্র ব্যবহার করা।
  • ​প্লাস্টিক বা পেপার প্যাকেজিংযুক্ত ফাস্টফুড কম খাওয়া।
  • ​ওয়াটারপ্রুফ কসমেটিক্স ও কেমিক্যালযুক্ত প্রসাধন এড়িয়ে চলা।
  • ​খাওয়ার পানি ভালো মানের রিভার্স অসমোসিস (RO) বা অ্যাক্টিভেটেড কার্বন ফিল্টার দিয়ে পরিশোধিত করে পান করা।

​সাধারণ কিছু প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)

​প্রশ্ন ১: পিফাসকে “ফরএভার কেমিক্যাল” কেন বলা হয়?

উত্তর: পিফাস যৌগের কার্বন ও ফ্লোরিনের রাসায়নিক বন্ধন অত্যন্ত শক্ত। এটি প্রাকৃতিকভাবে আলো, তাপ বা বাতাসের প্রভাবে ভেঙে যায় না। নদী-নালা, মাটি কিংবা মানবদেহে প্রবেশের পর এটি প্রায় অবিকৃত অবস্থায় শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে থাকে বলেই একে “ফরএভার কেমিক্যাল” বা চিরস্থায়ী রাসায়নিক বলা হয়।

​প্রশ্ন ২: সাধারণ পানি ফুটালে কি পিফাস নষ্ট হয়ে যায়?

উত্তর: না, সাধারণ পানি ফুটালে পিফাস নষ্ট হয় না। কারণ এটি অত্যন্ত তাপ-সহনশীল রাসায়নিক। বরং পানি ফোটালে বাষ্প হয়ে পানি কমে গেলে পানিতে পিফাসের ঘনত্ব আরও বেড়ে যেতে পারে।

​প্রশ্ন ৩: রান্নার পাত্রে নন-স্টিক কোটিং স্ক্র্যাচ (দাঘ) হয়ে গেলে কি তা ব্যবহার করা উচিত?

উত্তর: একদমই উচিত নয়। নন-স্টিক পাত্রে আঁচড় লাগলে সেখান থেকে সরাসরি খাবারের সাথে পিফাসের রাসায়নিক উপাদান মিশে যায়, যা শরীরের জন্য অত্যন্ত বিষাক্ত।

​প্রশ্ন ৪: রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে কি শরীরে পিফাস শনাক্ত করা যায়?

উত্তর: হ্যাঁ, বিশেষায়িত ব্লাড সিরাম টেস্টের (Serum PFAS Testing) মাধ্যমে শরীরে পিফাসের উপস্থিতি ও ঘনত্ব পরিমাপ করা সম্ভব।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top